স্কুলের বড় মাঠটাকে আজ চেনাই যাচ্ছে না। সারি সারি বইয়ের দোকান, রঙিন পতাকা, মাইকে ছড়া আর গল্পের ঘোষণা। মাঠের এক পাশে চটপটি ও ঝালমুড়ির দোকানও বসেছে। উপজেলা বইমেলার শেষ বিকেল।
আয়মান আর নাফিস এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরছে। আয়মানের পকেটে তিন শ টাকা। অনেক দিন ধরে জমিয়েছে। আজ সে কিনবে ছবিসহ একটি বড় মানচিত্রের বই।
হঠাৎ নাফিস থেমে গেল।
‘আয়মান, পায়ের কাছে ওটা কী?’
ধুলোর ওপর পড়ে আছে বাদামি রঙের একটি মানিব্যাগ। এক পাশ সামান্য ছেঁড়া। আয়মান তুলে নিল। দুজন এদিক-ওদিক তাকাল। আশপাশের মানুষ যার যার মতো হাঁটছে; কেউ কিছু খুঁজছে বলে মনে হলো না।
‘খুলে দেখি?’ নাফিস নিচু স্বরে বলল।
আয়মান মানিব্যাগটি সামান্য খুলতেই কয়েকটি টাকার নোট চোখে পড়ল। তার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল। এই টাকা দিয়ে মানচিত্রের বইটির সঙ্গে আরও কত বই কেনা যায়!
পরক্ষণেই সে মানিব্যাগটি বন্ধ করে দিল।
‘চলো, তথ্যকেন্দ্রে দিয়ে আসি।’
নাফিস একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘ওরা যদি নিজেরাই রেখে দেয়?’
প্রশ্নটি আয়মানের মনেও এসেছিল। দুজনে ঠিক করল, মানিব্যাগটি কার হাতে দিচ্ছে তার নাম জেনে রাখবে এবং মালিক পাওয়া পর্যন্ত কাছেই থাকবে।
মানিব্যাগটি কেমন ছিল?
তথ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন তাদের স্কুলের বাংলা শিক্ষক মাহমুদ স্যার। সব শুনে তিনি মাইকে ঘোষণা দিলেন—একটি মানিব্যাগ পাওয়া গেছে। যার হারিয়েছে, তিনি যেন তথ্যকেন্দ্রে এসে মানিব্যাগের রং, বিশেষ চিহ্ন এবং ভেতরে কী ছিল তা বলে নিয়ে যান।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন তরুণ এসে বলল, তার কালো মানিব্যাগ হারিয়েছে। ভেতরে চার হাজার টাকা ছিল। বর্ণনা মিলল না। সে ফিরে গেল।
আরও কিছু সময় কেটে গেল। মাগরিবের আযান হতে বেশি দেরি নেই। দোকানিরা বাতি জ্বালাতে শুরু করেছেন। আয়মানের চোখ বারবার মানচিত্রের বইটির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু মানিব্যাগের মালিকের জন্যও তার চিন্তা হচ্ছে। এতগুলো টাকা হারিয়ে মানুষটি এখন কী অবস্থায় আছেন কে জানে!
এমন সময় মাঝবয়সী এক ব্যক্তি প্রায় ছুটতে ছুটতে তথ্যকেন্দ্রে এলেন। কপালে ঘাম, মুখে উৎকণ্ঠা।
‘আমার একটি মানিব্যাগ হারিয়েছে। বাদামি রঙের। ডান পাশটা একটু ছেঁড়া।’
মাহমুদ স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভেতরে কী ছিল?’
লোকটি টাকার পরিমাণ বললেন। আরও বললেন, ভেতরের ছোট পকেটে তাঁর মেয়ের একটি ছবি এবং ডাক্তারের দেওয়া ভাঁজ করা ব্যবস্থাপত্র আছে।
সবকিছু মিলে গেল। স্যার তাঁর হাতে মানিব্যাগটি তুলে দিলেন। মানুষটি সেটি খুলে একবার দেখলেন। তারপর যেন অনেকক্ষণ আটকে রাখা নিশ্বাস ছেড়ে দিলেন।
‘এই টাকা দিয়ে আমার মেয়ের ওষুধ কেনার কথা ছিল। কোথায় ফেলেছি বুঝতেই পারছিলাম না।’
যে আনন্দ কেনা যায় না
মাহমুদ স্যার আয়মান ও নাফিসকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওরা কুড়িয়ে পেয়েছে।’
লোকটি দুজনের মাথায় হাত রাখলেন। মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে দিতে চাইলেন। আয়মান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
‘না, চাচা। এটা তো আপনারই ছিল।’
লোকটির চোখ দুটি ভিজে উঠল। তিনি শুধু বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের উত্তম প্রতিদান দিন।’
এরপর আয়মান গেল সেই বইয়ের দোকানে। নিজের জমানো টাকা দিয়ে মানচিত্রের বইটি কিনল। দোকানি বইটি কাগজে মুড়ে তার হাতে দিলেন। ফেরার পথে আয়মান মোড়ক খুলে পৃথিবীর বড় মানচিত্রটি দেখছিল। নদী, পাহাড়, সাগর—কত কী!
নাফিস হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘বইটা কেমন লাগছে?’
আয়মানও হাসল। বলল, ‘খুব সুন্দর। তবে আজ মেলা থেকে এর চেয়েও সুন্দর একটা জিনিস নিয়ে ফিরছি।’
‘কী?’
আয়মান উত্তর দিল না। বুকের ভেতরের শান্তিটুকু কি হাতে নিয়ে দেখানো যায়?
