খলিফা যে রাজকীয় ঘোড়ায় চড়লেন না

·

2–3 মিনিট

পড়তে


দাফন শেষ হয়েছে। উপস্থিত লোকেরা ধীরে ধীরে ফিরছেন। এমন সময় নতুন খলিফার সামনে আনা হলো কয়েকটি চমৎকার ঘোড়া। প্রতিটি ঘোড়ার সঙ্গে একজন করে পরিচর্যাকারী। খলিফার চলাচলের জন্যই এগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

নতুন খলিফা উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ. সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এগুলো কী?’

তাঁকে জানানো হলো, এগুলো খিলাফতের বিশেষ বাহন। নতুন খলিফা এগুলোতেই চলাচল করবেন।

তিনি রাজি হলেন না। বললেন, ‘আমার নিজের বাহনটিই আমার জন্য বেশি উপযোগী।’ অতঃপর নিজের সাধারণ বাহনে চড়ে বসলেন। রাজকীয় ঘোড়াগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হলো। পরে সেগুলো বিক্রি করে মূল্য বায়তুল মালে জমা করার নির্দেশ দিলেন তিনি।

ঘটনাটি ৯৯ হিজরির। কিছুক্ষণ আগেই ইন্তেকাল করেছেন খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক। তাঁর জানাযা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর রেখে যাওয়া অসিয়ত অনুসারে মুসলিম জাহানের খিলাফতের দায়িত্ব এসেছে উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-এর কাঁধে। অথচ দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মুহূর্তেই তিনি নিজের জন্য সাজানো আড়ম্বর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

তাঁকে খিলাফতের নির্ধারিত বাসভবনে উঠতেও বলা হয়েছিল। তিনি দেখলেন, আগের খলিফার পরিবার তখনো সেখানে রয়েছে। তাদের সরিয়ে দিয়ে নিজে প্রবেশ করলেন না। জানিয়ে দিলেন, তাঁর বর্তমান থাকার জায়গাটিই যথেষ্ট; তাঁরা অবকাশমতো সরে গেলেই হবে।

দায়িত্বের শুরু নিজের কাছ থেকে

রাজকীয় ঘোড়ায় না-চড়া কি শুধু সাধারণ জীবন পছন্দ করার ঘটনা? না, এর ভেতরে আরও বড় একটি কথা ছিল। রাষ্ট্রের জন্য রাখা সম্পদ রাষ্ট্রেরই। খলিফা তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন; ইচ্ছামতো ভোগ করার মালিক নন।

উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ. তাই অন্যের হিসাব নেওয়ার আগে নিজের হিসাব নিতে শুরু করলেন। তাঁর হাতে থাকা জমি, মূল্যবান সামগ্রী ও উপঢৌকনের মধ্যে যেগুলো নিয়ে অন্যায় কিংবা সন্দেহ ছিল, একে একে সেগুলো ছেড়ে দিলেন। তিনি বলেছিলেন, অন্যায়ভাবে দেওয়া এসব সম্পদ গ্রহণ করা তাদের জন্য ঠিক ছিল না; এখন তার হিসাব আল্লাহর কাছে তাঁকেই দিতে হবে।

কাজটি সহজ ছিল না। নিজের ও পরিবারের প্রাচুর্য কমে গেল। নিকটজনদের কেউ কেউ অসন্তুষ্টও হলো। কিন্তু তিনি যে পথ ধরেছিলেন, সে পথ তো শুধু সুন্দর কথা বলার পথ নয়। সে পথ হক ফিরিয়ে দেওয়ার, নিজের ক্ষতি হলেও ইনসাফের পাশে দাঁড়ানোর।

পুরোনো আলোকিত পথের খোঁজে

উমর রাহ. নতুন কোনো অভিনব শাসনপদ্ধতি দেখাতে চাননি। তিনি ফিরে যেতে চেয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের দেখানো পথে। এজন্য আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর পুত্র সালেম রাহ.-এর কাছে তিনি চিঠি লিখেছিলেন—উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনপদ্ধতি তাঁকে লিখে জানাতে, যেন তিনি সে অনুযায়ী চলতে পারেন।

কত আশ্চর্য! বিশাল রাষ্ট্রের শাসক হয়েও তিনি নিজেকে সবজান্তা ভাবলেন না। সঠিক পথ জানতে চাইলেন। ভালো পূর্বসূরিদের জীবন পড়লেন। তারপর শিক্ষা শুরু করলেন অন্যদের দিয়ে নয়—নিজেকে দিয়ে।

তুমি হয়তো কোনো রাষ্ট্রের দায়িত্বে নেই। কিন্তু তোমারও ছোট ছোট দায়িত্ব আছে। শ্রেণিকক্ষের দলনেতা হলে, খেলার দলের অধিনায়ক হলে কিংবা ছোট ভাইবোনকে দেখাশোনার ভার পেলে তুমি কী করো? সবার আগে নিজের সুবিধা খোঁজো, নাকি সবার হক ঠিকমতো পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করো?

সেদিন রাজকীয় ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে ছিল নতুন খলিফাকে বহন করার জন্য। তিনি সেগুলোতে চড়লেন না। কিন্তু তাঁর সেই ছোট্ট সিদ্ধান্ত মানুষকে আজও বহন করে নিয়ে যায় ইনসাফ, আমানতদারি ও সত্যিকার নেতৃত্বের পাঠশালায়।


সূত্র : ইবনু আবদিল হাকাম, সীরাতু উমর ইবনে আবদিল আযীয আলা মা রাওয়াহুল ইমাম মালিক ইবনু আনাস ওয়া আসহাবুহু; ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১২৫; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০১ হিজরির ঘটনাবলি।

Discover more from Mim Zaman Knowledge Studio

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading