চাঁদটি আমার সঙ্গে হাঁটে কেন?

·

2–4 মিনিট

পড়তে


সৃষ্টিকে দেখো, স্রষ্টাকে পাবে

এশার নামায শেষে আব্বুর সঙ্গে বাড়ি ফিরছে মাহির। আকাশ পরিষ্কার। গোল চাঁদটি কখনো গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে, কখনো টিনের চালের ওপর এসে বসেছে বলে মনে হচ্ছে।

কিছু দূর হেঁটে মাহির পেছনে তাকাল। তারপর আবার সামনে। চাঁদটিও যেন জায়গা বদলে তার সঙ্গে চলে এসেছে!

সে হাঁটার গতি বাড়াল। চাঁদও চলছে। সে থামল। চাঁদও যেন থেমে গেল।

‘আব্বু, চাঁদটা কি আমাদের বাড়ি পর্যন্ত যাবে?’

আব্বু আকাশের দিকে তাকালেন। ‘তোমার কেন এমন মনে হলো?’

‘ওই যে, আমরা যত হাঁটছি, চাঁদটাও আমাদের সঙ্গে হাঁটছে। গাছগুলো পেছনে চলে যাচ্ছে, বাড়িগুলোও চলে যাচ্ছে। শুধু চাঁদটা যাচ্ছে না।’

আব্বু বললেন, ‘খুব সুন্দর করে লক্ষ করেছ। এখন একটি পরীক্ষা করবে?’

আঙুল দিয়ে ছোট্ট পরীক্ষা

মাহিরকে রাস্তার পাশে নিরাপদ জায়গায় দাঁড় করিয়ে আব্বু বললেন, ‘একটি আঙুল চোখের খুব কাছে ধরো। এবার শুধু বাঁ চোখ দিয়ে দেখো। তারপর বাঁ চোখ বন্ধ করে শুধু ডান চোখ দিয়ে দেখো।’

মাহির অবাক হয়ে বলল, ‘আঙুলটা তো লাফ দিয়ে সরে গেল!’

‘এবার দূরের ওই তালগাছটির দিকে তাকিয়ে একই কাজ করো।’

মাহির পরীক্ষা করে দেখল, তালগাছটিও একটু সরে যাচ্ছে বলে মনে হয়; কিন্তু কাছের আঙুলটির মতো এতটা নয়।

আব্বু বললেন, ‘কাছের জিনিসের দিকে আমাদের দেখার জায়গা সামান্য বদলালেও তার অবস্থান অনেকটা বদলে গেছে বলে মনে হয়। দূরের জিনিসের ক্ষেত্রে পরিবর্তনটি হয় খুব সামান্য। একে বিজ্ঞানের ভাষায় দৃষ্টিকোণের পরিবর্তন বা প্যারাল্যাক্স বলা হয়।’

‘চাঁদ কি তালগাছের চেয়েও অনেক দূরে?’

‘অনেক অনেক দূরে। পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় তিন লক্ষ চুরাশি হাজার কিলোমিটার। আমরা কয়েক শ কদম হাঁটলে সেই বিরাট দূরত্বের তুলনায় আমাদের অবস্থান বদলায় খুবই সামান্য। তাই গাছ, দেয়াল ও বৈদ্যুতিক খুঁটি দ্রুত পেছিয়ে গেলেও চাঁদকে প্রায় একই দিকে দেখা যায়। তখন মনে হয়, সে-ও আমাদের সঙ্গে চলছে।’

মাহির কিছুক্ষণ চুপ করে হাঁটল। তারপর বলল, ‘তাহলে চাঁদ আসলে আমাদের পেছনে আসছে না?’

‘না। তবে চাঁদ নিজেও স্থির নয়। সে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে; পৃথিবীও ঘুরছে এবং সূর্যের চারদিকে চলছে। আল্লাহর সৃষ্টি এই বিরাট জগতে সবাই যেন নিজ নিজ পথে চলেছে।’

জানা থেকে ভাবা

মাহির আবার চাঁদের দিকে তাকাল। একটু আগে চাঁদকে তার খেলাসঙ্গী মনে হচ্ছিল। এখন মনে হচ্ছে, আকাশে ভেসে থাকা এক বিশাল জগৎ—দূরে থেকেও যার আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়।

আব্বু বললেন, ‘চাঁদের নিজের আলো নেই। সূর্যের আলো তার গায়ে পড়ে আমাদের চোখে ফিরে আসে। মাসের বিভিন্ন সময়ে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের অবস্থান বদলায় বলে আমরা চাঁদের আলোকিত অংশটুকু কখনো সরু বাঁকা হেলাল, কখনো অর্ধেক, কখনো পূর্ণ গোল দেখি।’

‘তাহলে চাঁদ দেখে মাসের তারিখও বোঝা যায়?’

‘হ্যাঁ। আল্লাহ তাআলা সূর্যকে দীপ্তিমান করেছেন, চাঁদকে করেছেন আলো; আর চাঁদের জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল—যাতে মানুষ বছর ও সময়ের হিসাব জানতে পারে।’

هُوَ الَّذِيْ جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاءً وَّالْقَمَرَ نُوْرًا وَّقَدَّرَهٗ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوْا عَدَدَ السِّنِيْنَ وَالْحِسَابَ

তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিমান এবং চাঁদকে আলো; আর তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল, যাতে তোমরা বছরের সংখ্যা ও হিসাব জানতে পারো। —সূরা ইউনুস (১০) : ৫

বাড়ির দরজায় পৌঁছে মাহির শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদ তখনো তার সঙ্গেই আছে বলে মনে হচ্ছে। এখন সে জানে, কেন এমন মনে হয়। কিন্তু কারণটি জানার পর তার বিস্ময় কমে গেল না; বরং আরও বেড়ে গেল।

এত দূরের চাঁদ। কত নিয়মে তার চলা। তার আলো, তার মনযিল, তাকে দেখে মানুষের মাস ও বছরের হিসাব—সবকিছু কে এমন মাপে সাজিয়ে দিলেন?

মাহির মনে মনে বলল, ‘সুবহানাল্লাহ!’

চাঁদ কেন সঙ্গে হাঁটে বলে মনে হয়—বিজ্ঞান তাকে কারণটি বুঝিয়েছে। আর সেই কারণ নিয়ে ভাবতে ভাবতে তার হৃদয় পৌঁছে গেছে সৃষ্টিকর্তার কুদরত ও প্রজ্ঞার কাছে। জ্ঞান যখন মানুষকে আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেয়, তখন জানা আর যিকির যেন হাত ধরাধরি করে চলে।

Discover more from Mim Zaman Knowledge Studio

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading