ফজরের নামাযের পর মসজিদের এক কোণে বসে একজন বৃদ্ধ কুরআন পড়ছেন। ধীরে ধীরে, ভারী কণ্ঠে। একটি আয়াত শেষ হলে একটু থামছেন, আবার পড়ছেন। তিলাওয়াত শেষ করে মুসহাফ বন্ধ করলেন, চোখে-মুখে হাত বুলালেন এবং গভীর যত্নে কিতাবটি তুলে রাখলেন। দৃশ্যটি সুন্দর। আমাদের ঘরে ঘরে, মসজিদে মসজিদে এমন দৃশ্য যত বাড়বে, ততই কল্যাণ।
কিন্তু মুসহাফটি তুলে রাখার পরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়—যে আয়াতগুলো এইমাত্র পড়লাম, সেগুলো আমার কাছে কী চাইল? কী জানাল? আমার চিন্তা, স্বভাব ও চলার পথে কোথাও কি তার সাড়া পড়ল?
প্রশ্নটি তিলাওয়াতের মর্যাদা কমানোর জন্য নয়। কুরআনের প্রতিটি হরফ পাঠে সওয়াব; সহীহভাবে পড়া, মুখস্থ করা, বারবার তিলাওয়াত করা—সবই মুমিনের সৌভাগ্য ও ইবাদত। প্রশ্নটি বরং এই মহা-ইবাদতকে তার আরও বিস্তৃত ফলের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কারণ কুরআন নিজেই শুধু পাঠ করতে বলেনি; তার আয়াত নিয়ে চিন্তা করতে, উপদেশ গ্রহণ করতে এবং তার দেখানো পথে চলতেও বলেছে।
কিতাবটি কেন নাযিল হয়েছে?
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ.
এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে। —সূরা ছদ (৩৮) : ২৯
আয়াতে প্রথমেই কুরআনকে বলা হয়েছে মুবারক—বরকতময়। তারপর সেই বরকত লাভের একটি পথ দেখানো হয়েছে: আয়াত নিয়ে তাদাব্বুর এবং তা থেকে উপদেশ গ্রহণ। অর্থাৎ শব্দ যবান দিয়ে অতিক্রম করবে, অর্থ প্রবেশ করবে মস্তিষ্কে, আর তার ডাক পৌঁছবে হৃদয়ে। তখনই পাঠ জীবনকে নাড়া দিতে শুরু করবে।
আমরা কুরআনকে হেদায়াতের কিতাব বলি। কিন্তু হেদায়াত মানে শুধু পথের মানচিত্র কাছে রাখা নয়; মানচিত্র দেখে পথ চিনে নেওয়া এবং সে পথে পা বাড়ানো। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অত্যন্ত সুন্দর করে পড়ল, চুমু খেল, যত্নে তুলে রাখল—কিন্তু ওষুধ গ্রহণ করল না; তাহলে ব্যবস্থাপত্রের প্রতি তার সম্মান কি পূর্ণ হলো? তুলনাটি কুরআনের মর্যাদা বোঝানোর জন্য নয়; নিজের আচরণের অসংগতি ধরার জন্য।
আয়াত যখন আমাকে প্রশ্ন করে
সূরা ওয়াকিআহ পড়তে পড়তে আমরা উচ্চারণ করি—তোমরা যে পানি পান কর, তা কি তোমরা মেঘ থেকে বর্ষণ করাও, না আমিই তার বর্ষণকারী? আমি ইচ্ছা করলে তাকে লবণাক্ত করে দিতে পারি; তবু কেন তোমরা শোকর কর না? —সূরা ওয়াকিআহ (৫৬) : ৬৮-৭০
আয়াতটি পড়েই যদি একটু থামি! হাতের গ্লাসটির দিকে তাকাই। এই স্বচ্ছ পানি কোথা থেকে এল? সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বাষ্প হলো, মেঘে জমল, আকাশপথ পাড়ি দিল, বৃষ্টি হয়ে নামল, মাটির গভীরে সংরক্ষিত হলো—তারপর কত পথ ঘুরে পৌঁছল আমার ঠোঁটে। এত দীর্ঘ ব্যবস্থার কোনোটিই আমার হাতে নয়; অথচ আমি কত নিশ্চিন্তে পানি পান করি!
এই দেখা ও ভাবনার পর হৃদয় থেকে যদি বেরিয়ে আসে—আলহামদু লিল্লাহ—তাহলে তিলাওয়াত আর জীবনের মাঝখানের দূরত্ব একটু কমে যায়। যিকিরের সঙ্গে ফিকির যুক্ত হয়। আয়াতটি তখন শুধু পাঠের খাতায় থাকে না; এক গ্লাস পানির প্রতিও আমার দৃষ্টি বদলে দেয়।
কুরআনের একেকটি আয়াত এভাবেই আমাদের সামনে একেকটি আয়না ধরে। কোথাও আমার অহংকার দেখা যায়, কোথাও গাফলত; কোথাও ভয়কে শোধরানো হয়, কোথাও আশাকে জাগানো হয়; কোথাও মানুষের হক স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, কোথাও নিভৃতে করা গুনাহ থেকে ফিরে আসতে বলা হয়। প্রশ্ন হলো—আমি কি সেই আয়নায় নিজেকে দেখি, নাকি আয়াতগুলো কেবল অন্যদের মাপার জন্য পড়ি?
তাদাব্বুর কি যে যার মতো অর্থ করা?
না। কুরআন নিয়ে ভাবা মানে নিজের পছন্দের কথা আয়াতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। যে কালাম আল্লাহর, তার অর্থ বোঝার পথও আমানতদারির। আয়াতের ভাষা, আগে-পরে বলা কথা, নাযিলের প্রেক্ষাপট, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাখ্যা এবং নির্ভরযোগ্য তাফসীরের সাহায্য নিতে হবে। যা জানি না, তা আলেমদের কাছে জেনে নিতে হবে।
তবে “আমি আলেম নই” বলে উপদেশ গ্রহণের দরজাও বন্ধ করা যাবে না। আল্লাহ যখন বলেন, গীবত করো না—আমি নিজের যবানকে দেখব। যখন বলেন, ওয়াদা পূর্ণ কর—আমি নিজের অঙ্গীকারগুলোর হিসাব নেব। যখন তাঁর নিআমতের কথা স্মরণ করান—আমি শোকর করব। আর কোনো আয়াতের সূক্ষ্ম অর্থ ও বিধান বুঝতে না পারলে জিজ্ঞাসা করব। এটাই তো নিরাপদ পথ: মনগড়া ব্যাখ্যা নয়, আবার চিন্তাহীন পাঠও নয়।
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا.
তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না, না তাদের হৃদয়ে তালা লেগে আছে? —সূরা মুহাম্মাদ (৪৭) : ২৪
কঠিন প্রশ্ন! কুরআন সামনে আছে, তিলাওয়াতও হচ্ছে; তবু হৃদয়ের দুয়ার যদি বন্ধ থাকে, আয়াত ভেতরে প্রবেশ করবে কীভাবে? হৃদয়ের তালা খুলতে হয় মনোযোগ দিয়ে, বিনয় নিয়ে, নিজের ভুল স্বীকার করার প্রস্তুতি নিয়ে। যে শুধু নিজের মতের সমর্থন খোঁজে, সে কুরআনের কাছে পথ জানতে আসে না; নিজের পথের সনদ নিতে আসে।
পাঠের পর একটি পদক্ষেপ
প্রতিদিন অনেক আয়াত পড়েও আমরা হয়তো সবগুলোর মর্মে পৌঁছতে পারব না। কিন্তু একটি আয়াতের সামনে সচেতনভাবে থামতে তো পারি। তরজমা পড়তে পারি। নির্ভরযোগ্য তাফসীর থেকে তার বক্তব্য জেনে নিতে পারি। তারপর নিজেকে একটি ছোট প্রশ্ন করতে পারি—আজকের জীবনে এই আয়াতটির একটি দাবি আমি কোথায় পালন করব?
হয়তো একটি কটু কথা থামিয়ে দেব। কারো পাওনা ফিরিয়ে দেব। কোনো নিআমতের জন্য দুই রাকাত শোকর আদায় করব। ভেঙে পড়া মনে আল্লাহর ওয়াদা আবার স্মরণ করব। কিংবা বহুদিনের কোনো ভুল থেকে ফেরার সিদ্ধান্ত নেব। একটি আয়াত, একটি উপলব্ধি, একটি পদক্ষেপ—এভাবেই তো জীবনে কুরআনের আলো ছড়িয়ে পড়ে।
কুরআন অবশ্যই পড়ার কিতাব। বারবার পড়ার, সুন্দর করে পড়ার, শুনে হৃদয় ভেজানোর কিতাব। কিন্তু শুধু পড়েই তুলে রাখার কিতাব নয়। এ কিতাব এসেছে আমাদের জাগাতে, শোধরাতে এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পথ দেখাতে।
আসুন, মুসহাফ খোলার সময় যবান ও চোখের সঙ্গে হৃদয়টিও খুলি। পড়ি, বুঝতে চেষ্টা করি, তারপর সাড়া দিই। আল্লাহর কালাম যেন আমাদের কণ্ঠে থাকে, চিন্তায় থাকে এবং জীবনের চলার পথেও দৃশ্যমান হয়।
