কুরআনকে সম্মান করি—শিক্ষাব্যবস্থায় তার জায়গা কোথায়?

·

3–4 মিনিট

পড়তে


মুসহাফের দিকে আমরা শ্রদ্ধাভরে হাত বাড়াই; কুরআনের অবমাননার সংবাদে আমাদের অন্তর কেঁপে ওঠে। এ ব্যথা ঈমানেরই ব্যথা। কিন্তু কুরআনের সম্মান কি কেবল তাকে অপমানের হাত থেকে রক্ষা করার নাম? যে কিতাবকে আমরা আল্লাহর কালাম ও জীবনের হেদায়াত বলে মানি, তাকে সহীহভাবে শেখা, নিয়মিত পড়া, মন দিয়ে বোঝা এবং ব্যক্তি ও সমাজের জীবনে মর্যাদার আসন দেওয়াও তো তার সম্মানের অবিচ্ছেদ্য দাবি।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সম্মানিত খতীব মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক হাফিযাহুল্লাহ তাঁর ‘এগুলোও কুরআন অবমাননা’ নিবন্ধে এই গভীর প্রশ্নটির দিকে দৃষ্টি ফিরিয়েছেন। বাহ্যিক সম্মানের পাশাপাশি কুরআন শেখা, পড়া, শোনা, তার হেদায়াতকে সত্য বলে গ্রহণ করা এবং জীবনে তাকে স্থান দেওয়াও কুরআনের কদরের অংশ।

শিক্ষাব্যবস্থার একটি নীরব বৈপরীত্য

একটি শিশু বিদ্যালয়ে বহু বছর কাটায়। সে গণিত, বিজ্ঞান, ভাষা, ইতিহাস, প্রযুক্তি ও নানা জীবনদক্ষতা শেখে। অথচ আমাদেরই বহু সন্তান দশ-বারো বছরের শিক্ষাজীবন পার করেও আল্লাহর কিতাব সহীহভাবে পড়ার সামর্থ্য অর্জন করে না। এটি পাঠ্যক্রমের সামান্য ঘাটতি নয়; আমাদের অগ্রাধিকারের পরিচয়বাহী একটি প্রশ্ন।

আমরা মুখে কুরআনকে আল্লাহর কালাম ও জীবনের হেদায়াত বলি। অথচ শিক্ষার সবচেয়ে সংগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় তার জন্য মর্যাদাপূর্ণ, কার্যকর ও পরিমাপযোগ্য স্থান না রাখলে ঘোষিত বিশ্বাস এবং বাস্তব ব্যবস্থার মধ্যে গভীর ফাঁক তৈরি হয়। শায়খের সতর্কবাণীর মর্ম এখানেই: সমাজ যখন শিশুকে নানা অনাবশ্যক, এমনকি গুনাহের পথ খুলে দেওয়া বিষয় শেখাতে সম্পদ ব্যয় করে, অথচ কুরআন শেখানোর বাধ্যবাধকতা অনুভব করে না, তখন এই অবহেলা কুরআনের মর্যাদার প্রতি এক সূক্ষ্ম আঘাতে পরিণত হয়।

কুরআন শিক্ষা বলতে কী বোঝায়?

এখানে কেবল ধর্মীয় বিষয়ের পরীক্ষার বই বোঝানো হচ্ছে না, কিংবা প্রত্যেক শিশুকে আলেম বানানোর পাঠ্যক্রমও নয়। একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর ন্যূনতম কুরআনি সাক্ষরতার কয়েকটি স্তর থাকা উচিত: সহীহভাবে পড়ার সামর্থ্য; প্রয়োজনীয় সূরা ও আয়াতের মৌলিক অর্থ জানা; কুরআনের সঙ্গে নিয়মিত ব্যক্তিগত সম্পর্ক; এবং নৈতিক-আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ হিসেবে তার মর্যাদা বোঝা।

পাঠদানের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন শিক্ষা যেন ভীতি, অপমান, যান্ত্রিক মুখস্থ কিংবা পরীক্ষার চাপে শিশুর কাছে ভার হয়ে না ওঠে। প্রশিক্ষিত শিক্ষক, বয়সোপযোগী পাঠক্রম, শুদ্ধ উচ্চারণ, অর্থের পরিচয়, আনন্দময় অনুশীলন এবং বিশেষ প্রয়োজনসম্পন্ন শিক্ষার্থীর জন্য উপযোগী সহায়তা—এসব ছাড়া বাধ্যতামূলকতা কাগজে থাকবে, হৃদয়ে পৌঁছাবে না।

পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র

শুধু সরকার বা বিদ্যালয়কে দায়ী করে পরিবারের দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তান যদি স্কুলে কুরআন না শেখে, পরিবার কী ব্যবস্থা করছে? বাবা-মা নিজেরা পড়েন কি? ঘরের শিশুর কাছে কুরআন কি কেবল উঁচু তাকে গিলাফে রাখা পবিত্র বস্তু, নাকি পরিবারের জীবন্ত সঙ্গী?

একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও শেষ হয় না। মুসলিম শিক্ষার্থীর জন্য পর্যায়ভিত্তিক ন্যূনতম কুরআন শিক্ষা নিশ্চিত করা, যোগ্য শিক্ষক গড়ে তোলা, সময় বরাদ্দ করা এবং শেখার ফল সত্যিকারভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অন্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীর নিজ ধর্ম শিক্ষার অধিকার ও মর্যাদাও সমভাবে রক্ষা করতে হবে—ন্যায়বোধ ইসলামী শিক্ষারই দাবি।

কুরআন ও আধুনিক শিক্ষা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়

কুরআন শিক্ষা মানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা পৃথিবী-জ্ঞানকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং পূর্ণ শিক্ষার প্রশ্ন হলো: একটি মুসলিম শিশুকে সৃষ্টিজগৎ পড়ার জ্ঞান দেওয়া হবে, অথচ তার রবের কালাম পড়ার সামর্থ্য দেওয়া হবে না—এ অসম্পূর্ণতা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়?

বিজ্ঞান তাকে জগতের কার্যপ্রণালি বুঝতে সাহায্য করবে; কুরআন তাকে জগতের অর্থ, মানুষের মর্যাদা এবং নিজের নৈতিক দায়িত্ব স্মরণ করাবে। একটিকে প্রতিষ্ঠা করতে অন্যটিকে নির্বাসিত করার প্রয়োজন নেই।

সম্মানের সত্যিকার পরীক্ষা

আমরা কুরআনকে চুমু খাই—কিন্তু পড়ি কি? গিলাফে রাখি—কিন্তু বুঝি কি? উঁচু স্থানে রাখি—কিন্তু শিক্ষায় তাকে কতটা উঁচু স্থান দিই? অন্যের হাতে প্রকাশ্য অপমান দেখে ক্ষুব্ধ হই—কিন্তু নিজেদের অবহেলার মধ্যে তার হক নষ্ট হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও কি করি?

কুরআনের সম্মান তখনই পূর্ণ হয়, যখন মুসহাফের বাহ্যিক মর্যাদার সঙ্গে তিলাওয়াত, শিক্ষা, বোঝাপড়া ও আনুগত্যের মর্যাদাও রক্ষা পায়। একটি মুসলিম শিশুর নিজের কিতাব শেখা আকস্মিক অতিরিক্ত কার্যক্রম নয়; তার মৌলিক শিক্ষার অংশ হওয়া উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের তাঁর কালামের যথাযথ কদর করা, শেখা, শেখানো এবং জীবনে ধারণ করার তাওফীক দিন। আমীন।

মূল অনুপ্রেরণা

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সম্মানিত খতীব মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক হাফিযাহুল্লাহ, ‘এগুলোও কুরআন অবমাননা’, মাসিক আলকাউসার, শাবান ১৪৪৭ / ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বর্তমান নিবন্ধটি মূল প্রবন্ধের শিক্ষা ও প্রশ্নকে সামনে রেখে স্বতন্ত্রভাবে রচিত; শিক্ষাপদ্ধতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক অধিকার এবং বাস্তবায়নের কয়েকটি প্রয়োজনীয় দিক এখানে প্রসারিত করা হয়েছে।

Discover more from Mim Zaman Knowledge Studio

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading